আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনী প্রধান গত বুধবার (১১ নভেম্বর) রাতে ‘হিজবুল্লাহর শহীদ দিবসে’ প্রদত্ত বক্তব্যের শুরুতে শাইখ মুহাম্মাদ ‘আল-আফইউনি’র শাহাদাতের ঘটনায় সিরিয়ার জনগণকে, ‘উস্তাদ হাসান যাইদে’র শাহাদাতের ঘটনায় ইয়েমেনের জনগণ এবং বন্দী অবস্থায় শাহাদাত প্রাপ্ত ‘কামেল আবু ওয়াআরে’র শাহাদাতের ঘটনায় ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে।
‘আহমাদ কায়সার’ সম্পর্কে -যার শাহাদাতের দিনকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে- তিনি বলেন: ‘আহমাদ কায়সার’ ১৯৮২ সালে শাহাদাত প্রত্যাশী অভিযান চালিয়েছিলেন। এতে ১৪০ জন জায়নবাদী নিহত হয়। অভিযানটি ছিল আরব ও জায়নবাদীদের মাঝে সংঘর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হামল। ৩৮ বছর পূর্বে এমন এক দিনে ঐ হামলার পর (তৎকালীন ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট) এরিয়েল শ্যারনের হতাশ ও বিধ্বস্ত চেহারা আমার এখনো মনে আছে।
তিনি বলেন: প্রতিরোধ আন্দোলনের পথে শহীদদেরকে মূল্যায়ন করে হিজবুল্লাহ। এ জন্য যারাই এ পথে কদম রেখেছে তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
হিজবুল্লাহ প্রধান, সীমানা নির্ধারনের বিষয়ে লেবানন ও জায়নবাদী ইসরাইলের মধ্যকার আলোচনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: প্রথম থেকেই হিজবুল্লাহর অবস্থান ছিল, প্রতিরোধ আন্দোলন এ বিষয়ে মাথা ঘামাবে না, কেননা এর দায়িত্ব লেবানন সরকারের উপর।
সর্বদা বিতর্কিত অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ বিষয়ক আলোচনায় ভূমিকা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তারা সবসময় চাইতো এ আলোচনা জায়নবাদীদের পক্ষেই শেষ হোক। আবার কেউ কেউ সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি জায়নবাদীদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সাথে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছে; কোন অবস্থাতেই এটা ঠিক নয় এবং এ ধরনের দাবীকে আমরা মূল্যহীন মনে করি।
এই যে বলা হয়, ‘হিজবুল্লাহ [ইসরাইলের সাথে] সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়’ –এ ধরনের মন্তব্যের উদ্দেশ্য হল জায়নবাদী ইসরাইলের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়া। ইসরাইলের বিষয়ে হিজবুল্লাহর অবস্থান স্পষ্ট; হিজবুল্লাহ [ইসরাইলকে] অবৈধ সরকার মনে করে; যারা এ অঞ্চলের এবং ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
তিনি বলেন: লেবাননের সাথে বিতর্কিত গ্যাস ও তেল সমৃদ্ধ সামুদ্রিক এলাকা নিজের দখলে নিতে চায় ইসরাইল। এক্ষেত্রে যদি তারা লেবাননকে প্রাকৃতিক এ সম্পদ ব্যবহারে বাধা দেয় তবে লেবাননীয়রাও তাদেরকে বাধা দেবে।
নাসরুল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন: বর্তমানে লেবাননে ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের সক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরাসরি বলা যেতে পারে, ইসরাইল লেবাননের উপর যেকোন ধরনের হামলা চালাতে ভয় পায়। বিগত দিন ও সপ্তাহগুলোতে কোরোনার বাহানায় ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূখণ্ডের উত্তরে যে মহড়ার আয়োজন জায়নবাদী শত্রু করেছে তা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাদের স্থলবাহিনী প্রকৃত অর্থে বিপর্যয়ের মুখোমুখি। মহড়ার শুরু থেকে লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং আঙ্গুলগুলো দখলদার জায়নবাদী শত্রুর দিকে তাক করা গানের ট্রিগারের উপর রয়েছে। তাদের সামান্যতম বোকামির জবাব প্রতিরোধ আন্দোলন বিলম্ব ছাড়াই দেবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন প্রকার ছাড় দেয়া হবে না।
আমাদের সামনে স্পষ্ট যে, স্থল বাহিনীর ন্যায় জায়নবাদী বিমান ও নৌ বাহিনী আগের তুলনায় অধিক দুর্বল হয়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে প্রতিরোধ আন্দোলন নিজেদের শক্তি জায়নবাদী শত্রুদের উপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন নির্বাচনের প্রতি ইঙ্গিত করে নাসরুল্লাহ বলেন: এই নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। যা কিছু এ নির্বাচনে ঘটেছে তা মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক। আর এ বিষয়টি শুধুমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং ডেমোক্রেট দলের সাথে সম্পৃক্ত।
মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল হিজবুল্লাহর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে কোন পরিবর্তন আনবে না। মার্কিন কর্মকর্তার ইসরাইলকে সমর্থন করার বিষয়ে পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। অতএব, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে সমর্থন মার্কিন কর্মকর্তাদের যে মূলনীতির অন্তর্ভূক্ত, তা স্পষ্ট।
এতদসত্ত্বেও আমি ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের লজ্জাজনক ও অবমাননাকর পরাজয়ে আনন্দিত। কারণ, সে এখনো শহীদ কাসেম সোলাইমানি ও শহীদ আবু মাহদি আল-মুহান্দিসের কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডে নিজের সিদ্ধান্তে গর্ব করে। বাস্তবতা হল, ট্রাম্পের সরকার মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপরাধী সরকার। ট্রাম্প হত্যা, ফাসাদ ও অপরাধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা উন্মুক্ত করেছে। ট্রাম্প চলে যাবে কিন্তু ইরানি কর্মকর্তাদের ফোনকলের আক্ষেপ তার মনে রয়েই যাবে।
ইরান, সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলা প্রকল্পে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সে লেবানন ও ফিলিস্তিনেও পরাজিত হয়েছে। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ নামক বিতর্কিত প্রকল্পের তিন স্তম্ভের একটি ভেঙ্গে পড়বে।
সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, ট্রাম্পের মত ব্যক্তি –তার ক্ষমতার মেয়াদের অবশিষ্ট ২ মাসে- যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে। এজন্য ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন অক্ষের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে অবশিষ্ট ২ মাস সতর্ক থাকতে হবে। যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে যে কোন ধরনের পদক্ষেপ মোকাবিলা করা যায়।
জায়নবাদী শত্রুরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং তারা ভাল করেই জানে যে, বর্তমানে লেবাননের সেনাবাহিনী, জনগণ ও প্রতিরোধ আন্দোলন যে অবস্থানে রয়েছে তাতে লেবাননের বিষয়ে কোন পদক্ষেপ ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না।
২০০৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিরোধ আন্দোলন বিরোধী সকল পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র ও হামলা ব্যর্থ হয়েছে। আর এ সকল পরাজয়ের কারণে মার্কিনীরা ৩ বছর আগ থেকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে উস্কানি দেয়ার কাজ শুরু করে।
লেবাননের মুদ্রা ‘লিরা’র মূল্যহ্রাস থেকে শুরু করে প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয় যে, বৈরুতে মার্কিন দূতাবাস বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা পরিচালনা করে এবং সেগুলোকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।
লেবাননের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘জেবরান বাসিলে’র বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে তিনি বলেন: লেবাননের ভেতর থেকে কেউ কেউ জেবরান বাসিলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে মার্কিনীদেরকে উৎসাহিত করেছিল। বাসিল ইতিপূর্বে আমাকে জানিয়েছেন, মার্কিনীরা তাকে দু’টি অপশনের মাঝ দাঁড় করিয়েছে; ‘হিজুবল্লাহর সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ’ অথবা ‘নিষেধাজ্ঞার তালিকাভূক্ত হওয়া’।
মূলতঃ লেবানিজ ব্যক্তিত্বদের কর্তব্য নির্ধারণ এবং পরিশেষে তাদেরকে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভূক্ত করার অধিকার মার্কিনীদের নেই। মার্কিনীরা নিজেরাই সন্ত্রাসবাদ ও দূর্নীতির সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছে।
তিনি বলেন, আমরা জেবরান বাসিলের অবস্থানকে ‘সাহসিক’ বলে আখ্যায়িত করেছি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তার সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্যে সকলের প্রতি আহবান জানাই। সকলের জানা উচিত, ভবিষ্যতে মার্কিনীদের পদক্ষেপ আরো বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাদেরকেও মার্কিনীরা টার্গেট করতে পারে। আমরা আশাবাদী সাআদ হারিরি’র নেতৃত্বে লেবাননের নতুন মন্ত্রীসভা দ্রুত গঠিত হবে।#176